ঢাকাশুক্রবার, ৬ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

সন্ত্রাসী হামলাকে ধামাচাপা দিতে চায়, মামলার পরিবর্তে সমাধান করাতে মরিয়া চকরিয়ার ওসি “চন্দন”

মোঃ রুবেল
নভেম্বর ১৫, ২০২২ ৯:৪৭ অপরাহ্ণ
Link Copied!

চকরিয়া উপজেলার সুরাজপুর-মানিকপুর ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ড এলাকায় আবুল হাশেম কে হত্যা চেষ্টার ঘটনাকে ধামাচাপা দিতে মরিয়া চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) চন্দন কুমার চক্রবর্তী। গত ৭ নভেম্বর ভুক্তভোগীর স্বজনকে মুঠোফোনে কল দিয়ে (ওসি) বলেন, আমাকে রিকোয়েস্ট করছে জাতীয় দৈনিক কালের কণ্ঠ পত্রিকার চকরিয়া প্রতিনিধি ছোটন কান্তি নাথ এবং যুগান্তর পত্রিকার প্রতিনিধি মনছুর মহসীন এ বিষয়টি যেনো আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হয়।

সে কল রেকর্ড মাল্টিমিডিয়া নিউজ পোর্টাল সিএইচডি নিউজ ২৪’র পেইজে ইতিমধ্যে ভাইরাল হয়েছে। কলরেকর্ডে ওসিকে বলতে শোনা যায়, “আপনারা সবাই গণমাধ্যমের সাথে সম্পৃক্ত । আমাদের এখানেও আপনাদের পেশায় সম্পৃক্ত আছে তারাও রিকোয়েস্ট করছে। আমরা মামলার নেওয়ার জন্য রেডি। এখন মামলা নেওয়ার আগে  একটা প্রস্তাব, আমরা দুইটা পক্ষ কে নিয়ে যদি একটু বসি এবং সম্মান জনক নিষ্পত্তি করি… দোষ তো তাদের বেশি এইটা ক্লিয়ার। আমরা যদি চেয়ারম্যান এবং আপনাদের মধ্যস্থতাই বসে সম্মান জনক নিষ্পত্তিতে আসি তাহলে আপনাদের সম্মতি কতটুকু??

আমি কিন্তু বলছি যে দোষ তো তাদেরই!!। আমরা যদি তাদের কে পানিস্পেন্টর আওতায় নিয়ে আসি। দেখেন আল্টিমেটলি বিচার বা রায় দুই পক্ষই আসবে। আপনারা যদি সেই সুযোগটা দেন।!! আপনাদের তদন্তে কি আসছে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “দোষ তাদের বেশি এইটা নো ডাউট”। আমরা স্বীকার‌ই করলাম। সমস্যা নাই মামলা হলে হ‌ইতে পারে। এইটা লোকাল লি বসে শেষ করা যায় না? আমরা যদি তাদেরকে বিচারের আওতায় আনি। উনি মারামারি করতে যায় নাই। আমরা বসে ওদের উপযুক্ত বিচার করি। আমাদের পক্ষ থেকে রিকোয়েস্ট‌ই করলাম। আমাদের সব দিক খেয়াল রাখতে হয়, এখানকার স্থানীয় সাংবাদিকরা আমাদের কে রিকোয়েস্ট করছে! মামলা করার এভেলেবেল টাইম আছে । আজকে না নিলে পাঁচ দিন পরে দিবেন। আমি না নিলে কোটে দিবেন। আপার সাথে কথা বলে জানাবেন আমি অপেক্ষায় আছি “।

তবে এই সাবেক সেনা সদস্য মোঃ নুরুল আমিনের অপরাধ কর্মকান্ড দিন দিন বেড়েই চলেছে তার বিরুদ্ধে অভিযোগের কমতি নেই সাধারণ মানুষের। তার এসব অপরাধের কথা জেনেও কোন উদ্যোগ নেয়নি পুলিশ প্রশাসন। এর আগে, বিগত সময়ে নুরুল আমিনের নামে তার আপন ভাইয়ের স্ত্রী সুমি আক্তার নিজে শ্লীলতাহানী সহ গুমখুন করার হুমকি প্রদান করায় তিনি নিরুপায় হইয়া চকরিয়া থানায় গত (৩১ জুলাই) অভিযোগ দায়ের করেন। কিন্তু ভিকটিম অভিযোগ করলেও কোন সুরাহা পায়নি।

 

এছাড়া নুরুল আমিন আইন ও প্রশাসনকে অমান্য করে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে মাতা মুহুরী নদী হতে দীর্ঘদিন যাবৎ অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে এবং কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছে না। বিগত ৪ ডিসেম্বর ২০১৭ সালেও সুমি আক্তার নুরুল আমিনের বিরুদ্ধে স্থানীয় চেয়ারম্যান পরিষদে জমি বিক্রির টাকা আত্মসাতের মামলা দায়ের করেন। কিন্তু চেয়ারম্যান ও নুরুল আমিনের যোগসাজশে উক্ত ৪৪/২০১৭ নং মামলার কোন সুরাহা হয়নি। এছাড়া নুরুল আমিন সাবেক সেনা সদস্য হ‌ওয়ায় এবং চেয়ারম্যান এর ক্ষমতা দেখিয়ে একের পর এক হত্যাযজ্ঞের মত ঘটনা ও রাষ্ট্রীয় অপরাধ করে চলেছে।

 

এদিকে রুবেল নামে আরও এক ব্যক্তি গত ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২১ সালে বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সি.আর ১০৪৪/২১ নং মামলা দায়ের করেন। কিন্তু নুরুল আমিন সাবেক সেনা সদস্য পরিচয় দিয়ে দিনের পর দিন চাঁদাবাজি, অবৈধ বালু উত্তোলন, জায়গা দখলসহ নানা অপরাধ কর্মকাণ্ড করে যাচ্ছে।

গত ৫ নভেম্বর ভুক্তভোগী আবুল হাশেমকে মারধর করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি বাড়িতে গিয়েছিলাম শুক্রবার। গত ৫ নভেম্বর শনিবার ফজরের নামাজ পড়ে ভাইয়ের কবর জিয়ারত করে হেঁটে বোনের বাসার দিকে যাচ্ছি, কারণ আমার মেয়ের সাথে আমার ভাগ্নির‌ও পরীক্ষা। তার জন্য বোন ও ভাগ্নিকে নিয়ে শহরে চলে যাবো। কিন্তু বোনের বাসায় যেতেও পারি নাই। তার আগে আমার উপর অতর্কিত হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। ঘটনার সময় আমার কাছে থাকা মোবাইল, টাকা ও অফিসিয়াল মূল্যবান ডকুমেন্ট জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেয়।

 

তিনি বলেন, এই সন্ত্রাসীরা ধারালো ছোরা, লোহার রড ও লাঠিসোঁটা দিয়ে বেধড়ক মারধর করে এবং অস্ত্র-শস্র দিয়ে হত্যার চেষ্টাও করে তারা। আমাকে বাঁচাতে আমার ভাই ও ভাইয়ের ছেলে আসলে তাদের কেও মেরে জখম করে দেয়। পরবর্তীতে এলাকার লোকজন এসে আমাকে চকরিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে উন্নত চিকিৎসার জন্য রেফার করে চট্রগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।

তিনি আরো বলেন, এর আগে আমি চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সাথে দেখা করে এজাহার দায়ের করি। তারপর চট্রগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়। প্রচন্ড ব্যাথা হচ্ছে। ডাক্তার বললো হাঁড় ভাঙ্গিয়া দ্বিখন্ডিত হইয়া গিয়েছে। সম্পূর্ণ ঠিক হতে সময় লাগবে। আমি নুরুল আমিন ও তার সাঙ্গুপাঙ্গুর বিচার চাই। সেই সাবেক সেনা সদস্য পরিচয় দিয়ে এই রকম অপরাধ কর্মকান্ড প্রতিনিয়ত করে যাচ্ছে। তার নামে অনেক অভিযোগ ও মামলা রয়েছে। তার কঠোর শাস্তি চাই।

আবুল হাশেম বলেন, নুরুল আমিন প্রশাসন কে হাতে নিয়ে বারবার একি অপরাধ করে যাচ্ছে । সবার সাথে। আমিও ভুক্তভোগী। তার কঠোর শাস্তি দাবি করছি। আবুল হাশেমের এইচএসসি পরীক্ষার্থী মেয়ে কান্না করে বলেন, গত ৬ নভেম্বর থেকে আমার পরীক্ষা শুরু হয়েছে। আমাকে এবং আমার ফুফাতো বোনকে পরীক্ষার হলে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল বাবার, তার জন্য বাবা বাড়িতে গিয়েছে। আর ফুফুর বাড়িতে গিয়ে বোনকে নিয়ে আসবে, কারণ আমার সাথে বোনের‌ও পরীক্ষা ছিল। কিন্তু আমার জন্য দুঃখ জনক ঘটনা একদিনের জন্যও বাবা আমাকে নিয়ে যেতে পারে নাই।

তিনি বলেন, যারা আমার বাবাকে আঘাত করেছে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি এবং আমার বাবার কি অপরাধ ছিল। তারা বাবাকে এভাবে মেরেছে এবং মিথ্যা মামলাও দিয়েছে। যদি বাবার কিছু হইতো তাহলে আমাদের কি অবস্থা হতো। আমি প্রশাসন কে হাত জোর করে বলছি । যারা বাবাকে মারধর করেছে তাদের কে আইনের আওতায় আনা হোক।

এর আগে, কালের কণ্ঠ ও আজাদী পত্রিকার চকরিয়া উপজেলা প্রতিনিধি ছোটন কান্তি নাথ আবুল হাশেমের স্বজনের সাথে মুঠোফোনে বলেন, হাশেম ভাই বাদী হয়ে যে এজাহার দিয়েছে সেইটা মামলা রেকর্ড হোক, সমস্যা নাই। কিন্তু এখানে একটা স্টুডেন্ট আছে আবিদুল হাসান একে বাদ দিয়ে বয়স্ক আর একজনের নাম দিলে সমস্যা নাই! সেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। সেই আমার কালের কণ্ঠ শুভসংঘের সেক্রেটারী চকরিয়ার। আসামি যাদের কে করার হচ্ছে ওখানে একজন ইউনিভার্সিটির ছাত্র রাজশাহী ইউনিভার্সিটিতে পড়ে, সেই ঘটনায় ছিল না। এখন সেই না থাকার পরেও  আসামি হয়ে যাচ্ছে- তাকে বাদ দিয়ে অন্য আর একজনের নাম দিতে বলতেছি! আমি মামলা রেকর্ড না হোক সেইটা বলতেছি না?

ঘটনার বিষয়ে আবিদুল হাসান বলেন, ঘটনার সময় আমার আব্বু ছিল আম্মু ছিল। ২০১১ সাল থেকে আমরা ভাড়া বাসায় থাকি। মারামারি সময় আমরা ভাড়া বাসায় ছিলাম। এরপর তিনি প্রথমে অস্বীকার করলেও পরবর্তীতে তাকে প্রশ্ন করা হয়! বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে যে, আপনি ঘটনার সময় কালো টিশার্ট পরনে ছিলেন তখন তিনি স্বীকার করে বলেন, আমি সকালে ওই দিকে যাচ্ছিলাম। আমাকে দেখা গেলেও আমি মারামারিতে ছিলাম না? তবে সুরাজপুর-মানিকপুর ইউনিয়নে মারামারি ঘটনার বিষয়ে জানতে নুরুল আমিনকে একাধিকবার ফোন দিলে তার মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়।

এদিকে ঘটনার বিষয়ে এডভোকেট এম.জিয়া হাবিব আহ্সান বলেন, কোন ফোজদারি অপরাধ সংঘটিত হলে আমরা আইনের দৃষ্টিতে মনে করি রাষ্ট্রীয় অপরাধ এবং রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপরাধ করা হয়েছে। পুলিশ থানায় মামলা দেওয়া নিয়ে কোন ধরনের বিরুদ্ধ আপোষ করতে পারবে না। যেখানে একটা লোককে হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণ করা হয়েছে এবং গুরুত্বর জখম করা হয়েছে। থানায় যাওয়ার সাথে সাথে তার মামলাটা এন্টি করা উচিত। এখন এক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে যে তার মামলাটা সাথে সাথে গ্রহণ করা হয় নাই এবং টেকনিক্যালি ডিলে করে অপরাধীদের মামলাটা আগে এন্টি করে ভুক্তভোগীদের মামলাটা পরে এন্টি করেছে। ভুক্তভোগীর মামলা কে কাউন্টার মামলা দেখিয়েছে। যে থানা করেছে তারা পেশাগত দায়িত্বের অসৎ আচরণ করেছে এবং চালাকি করে আসামিদের বাঁচানোর চেষ্টা করেছে।

তিনি বলেন, অপরাধী শিক্ষার্থী কেন মসজিদের ইমাম হলেও তাকে শাস্তি পেতে হবে। আইনের উর্ধ্বে কেউ নয়। অব্যাহতি তিনি আগে থেকে কেমন করে দিবেন যদি তার বিরুদ্ধে সাক্ষী পাওয়া যায় এবং অপরাধের প্রমাণ পাওয়া যায় তাহলে তিনি কিভাবে অব্যাহতি দিবেন। যদিও তিনি অব্যাহতি দেওয়ার চেষ্টা করেন তাহলে ওসি এইটা ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন।

গত ৫ নভেম্বর চকরিয়া উপজেলায় সন্ত্রাসী হামলার প্রেক্ষিতে আবুল হাশেমের স্বজনদের কাছে ঘটনার দু’দিন পর ৭ নভেম্বর মুঠোফোনে কল দিয়ে ছিলেন চকরিয়ার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) চন্দন কুমার চক্রবর্তী, সেই মুঠোফোনের কথপোকথন নিয়ে NEWSDAY24  এর প্রতিবেদক (ওসি) চন্দন কুমার চক্রবর্তী-কে মুঠোফোনে কলদিয়ে জানতে চাইলে তিনি প্রথমত কথা বলতে রাজি হননি, পরবর্তী প্রশ্নে  মামলার পরিবর্তে সমাধান করা এবং আইনের কোন ধারায় মামলা না নিয়ে সমাধান করা যায় এমন প্রশ্ন করলে চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) চন্দন কুমার চক্রবর্তী উত্তর করেন, সরাসরি এসে কথা বলেন এবং ফোনকল কেটে দেন।

বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।