মনে হচ্ছে যেন, কোনো ফাঁদে আটকা পড়েছি’— ক্রিকেট থেকে বিরতি নিয়ে এভাবেই ভাঙা গলায় আক্ষেপ করেছিলেন আর্যমান বিরলা। একের পর এক চোটে জর্জরিত শরীর, তার সঙ্গে মানসিক অবসাদের লড়াইয়ে ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। সবশেষ ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ‘সাময়িক ছুটি’ নেন তিনি। তবে সেই ছুটি আর শেষ হয়নি।
“>১৯৯৫ সালে আদিত্য ভিক্রাম বিরলার মৃত্যুর পর থেকে এর নেতৃত্ব দিচ্ছেন আর্যমানের বাবা কুমার মাঙ্গালাম বিরলা। বর্তমানে বিশ্বের ৪২টি দেশে বিস্তৃত এই গ্রুপের ব্যবসা
এমন প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান হয়েও ক্রিকেটেই নিজের পরিচয় গড়তে চেয়েছিলেন আর্যমান। মুম্বাইয়ে সুযোগ সীমিত দেখে ১৭ বছর বয়সে পাড়ি জমান মধ্যপ্রদেশে। পরিবার থেকে দূরে থেকে জুনিয়র সার্কিটে ধাপে ধাপে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
অবশেষে ২০১৬-১৭ মৌসুমে সিকে নাইডু ট্রফিতে (অনূর্ধ্ব-২৩) নজর কাড়েন তিনি। ৯ ইনিংসে ৩ সেঞ্চুরিতে ৬০২ রান করে আসরের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হন, গড় ৭৫.২৫। এর আগে অবশ্য তার পারিবারিক পরিচয়ই বেশি আলোচিত হতো। মধ্যপ্রদেশ দলে নিজেকে অনেক সময় ‘আউটসাইডার’ মনে করতেন তিনি। পারফরম্যান্স দিয়েই সম্মান আদায়ের লক্ষ্য ছিল তার।
২০১৭ সালে ওড়িশার বিপক্ষে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেকের দিনই ভাঙা আঙুল নিয়ে খেলেন। ব্যথা সহ্য করে প্রায় দুই ঘণ্টা ক্রিজে থেকে রাজাত পাতিদারর সঙ্গে ৭২ রানের উদ্বোধনী জুটি গড়েন। এতে সতীর্থদের কাছেও সম্মান অর্জন করেন তিনি।
পরের মৌসুমে কলকাতার ইডেন গার্ডেনে বাংলার বিপক্ষে দ্বিতীয় ইনিংসে দীর্ঘ ২৭১ মিনিট ব্যাট করে ম্যাচ বাঁচানো সেঞ্চুরি করেন। তখনই নিজের পরিচয়ে পরিচিতি পেতে শুরু করেন।
সেই অভিজ্ঞতা তুলে ধরে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন—
“বিশ্বাস ও সম্মান অর্জনের সেরা উপায় হলো পারফরম্যান্স। যখন আমি রান করা শুরু করলাম, লোকে আমাকে অন্য চোখে দেখতে শুরু করল। মধ্যপ্রদেশে যখন প্রথম আসি, তখন নামের শেষ অংশের কারণেই বেশি পরিচিতি ছিল আমার। শুনতেই থাকতাম ‘বিরলার ছেলে, বিড়লার নাতি…।’ কিন্তু পারফরম্যান্স দিয়েই লোকের ধারণা বদলে দিয়েছি, তারা আমাকে ভিন্নভাবে দেখতে শুরু করেছে।”
“এখনও পর্যন্ত এটাই আমার সবচেয়ে বড় অর্জন। সম্প্রতি একজন এসে আমাকে বললেন, ‘আপনি এত সাদাসিদে, এত সহজ-সরল যে, জানতামই না আপনি বিরলা পরিবারের সন্তান।’ আমার কাছে এটা ছিল পরিবর্তনের একটা ইঙ্গিত।”
২০১৮ সালে আইপিএলের নিলামে ৩০ লাখ রুপিতে তাকে দলে নেয় রাজস্থান রয়্যালস। পরের মৌসুমেও দলে থাকলেও মাঠে নামার সুযোগ পাননি।
এরপরই শুরু হয় দুঃসময়। একের পর এক চোটে ২০১৯ সালের জানুয়ারির পর দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে থাকতে হয় তাকে। মানসিক অবসাদ গ্রাস করে ফেলে। অবশেষে ২২ বছর বয়সে ক্রিকেট থেকে ‘অনির্দিষ্টকালের ছুটি’ নেন।
“মনে হচ্ছে যেন, কোনো ফাঁদে আটকা পড়েছি। এতদিন পর্যন্ত সমস্ত কষ্টের মধ্যে দিয়ে নিজেকে ঠেলে নিয়ে গেছি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে নিজের মানসিক স্বাস্থ্য ও সুস্থতাকে অন্য সবকিছুর ঊর্ধ্বে রাখা প্রয়োজন। আমাদের প্রত্যেকেরই পথচলা নিজের মতো এবং এই সময়টা নিজেকে আরও ভালোভাবে বুঝতে, নতুন ও বৈচিত্র্যময় দৃষ্টিভঙ্গির জন্য মনকে উন্মুক্ত করতে এবং নতুন উপলব্ধির মধ্যে জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে বের করতে কাজে লাগাতে চাই।”
সেই সিদ্ধান্তই হয়ে ওঠে তার ক্রিকেট জীবনের শেষ অধ্যায়। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে অন্ধ্র প্রদেশের বিপক্ষে রাঞ্জি ট্রফির ম্যাচই থেকে যায় তার শেষ উপস্থিতি।
সাত বছর পর আবার ক্রিকেটে ফিরছেন তিনি, তবে ভিন্ন ভূমিকায়। প্রায় ৭৮ কোটি মার্কিন ডলার বা ১৬ হাজার ৬৬০ কোটি রুপির চুক্তিতে চার প্রতিষ্ঠানের কনসোর্টিয়াম বেঙ্গালুরু ফ্র্যাঞ্চাইজিটি কিনে নেওয়ার পর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেবেন আর্যমান।
আইপিএলে দল পেলেও কখনো খেলার সুযোগ না পাওয়া আর্যমানই এখন লিগটির অন্যতম তারকাখচিত দলটির মালিক। তাই দায়িত্ব বদলালেও ক্রিকেট নিয়ে এখন নতুন স্বপ্ন দেখতে আর বাধা নেই তার।
ভারতের আইপিএলের জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজি রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু (আরসিবি) রেকর্ড দামে বিক্রি হয়েছে। ভারতীয় ও বিদেশি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গঠিত একটি জোট প্রায় ১৭৮ কোটি মার্কিন ডলার (প্রায় ২১ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা) নগদ মূল্যে দলটির পূর্ণ মালিকানা কিনে নিয়েছে।
বর্তমান মালিক ইউনাইটেড স্পিরিটস লিমিটেড এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, তাদের পরিচালনা পর্ষদ ফ্র্যাঞ্চাইজিটি বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে। নতুন এই জোটে রয়েছে আদিত্য বীরলা গ্রুপ, টাইমস অব ইন্ডিয়া গ্রুপ, বোল্ট ভেঞ্চারস এবং ব্ল্যাকস্টোনের বিনিয়োগ কৌশল সংস্থা।
এখন পর্যন্ত ইউএসএলের সহযোগী প্রতিষ্ঠান রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স স্পোর্টস প্রাইভেট লিমিটেডের মাধ্যমে পরিচালিত পুরুষ ও নারী—দুই দলই এই জোটের মালিকানায় যাবে।
এই চুক্তির পরিমাণ যে কত বড়, তা বোঝা যায় ২০২১ সালে ভারতীয় ক্রিকেট নিয়ন্ত্রণ বোর্ড লখনৌ ও আহমেদাবাদ ফ্র্যাঞ্চাইজি দুই দল মিলিয়ে প্রায় ১২ হাজার ৭১৫ কোটি রুপিতে বিক্রি করেছিল। আরসিবির দাম সে দুই দলের চেয়েও অনেক বেশি।
এর আগে গত নভেম্বরে বৈশ্বিক পানীয় কোম্পানি ডিয়াজিও, যারা ভারতে ইউনাইটেড স্পিরিটস লিমিটেডের মালিক, জানায় যে তারা আরসিবিতে তাদের বিনিয়োগ নিয়ে কৌশলগত পর্যালোচনা করছে।
<তাদের মতে, ক্রিকেট তাদের মূল ব্যবসার অংশ নয় এবং চলতি বছরের ৩১ মার্চের মধ্যে বিক্রয় প্রক্রিয়া শেষ করার লক্ষ্য ছিল। তবে এই চুক্তি কার্যকর হতে এখনো ভারতীয় ক্রিকেট নিয়ন্ত্রণ বোর্ড ও ভারতের প্রতিযোগিতা কমিশনের অনুমোদন প্রয়োজন। ২০০৮ সালে আইপিএল শুরুর সময় আটটি দলের মধ্যে বেঙ্গালুরু দলটি ছিল দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দামে কেনা। সে সময় বিজয় মাল্যর ইউনাইটেড ব্রুয়ারিজ গ্রুপ ১১ কোটি ১৬ লাখ মার্কিন ডলারে দলটি কিনেছিল। পরে ২০২৩ সালে নারী লিগে বেঙ্গালুরু দল কিনতে প্রায় ৯০১ কোটি রুপি ব্যয় করা হয়, যা ছিল তৃতীয় সর্বোচ্চ। নতুন মালিকানা জোটের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মধ্যপ্রদেশের সাবেক ক্রিকেটার আর্যমান বীরলা পরিচালক এবং টাইমস গ্রুপের সত্যন গজওয়ানি সহ- পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। এক বিবৃতিতে জোটটি জানায়, ‘দলের শিরোপাজয়ী সংস্কৃতি, বেঙ্গালুরুর সঙ্গে গভীর সংযোগ এবং বিশ্বের অন্যতম আবেগী সমর্থকগোষ্ঠী—সব মিলিয়ে এটি একটি অসাধারণ সুযোগ। আমরা মাঠের ভেতরে ও বাইরে দলটিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’ ইউনাইটেড স্পিরিটস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী প্রভীন সোমেশ্বর বলেন, ‘দলটি লিগের অন্যতম পরিচিত ও বাণিজ্যিকভাবে সফল ফ্র্যাঞ্চাইজিতে পরিণত হয়েছে। শক্ত প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব ও নিজস্ব দর্শনের মাধ্যমে তারা একটি বিশ্বস্বীকৃত ব্র্যান্ড গড়ে তুলেছে।’ নতুন মালিকানা জোটে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। আদিত্য বীরলা গ্রুপ ধাতু, সিমেন্ট, ফ্যাশন ও খুচরা বাণিজ্যে সক্রিয় একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান। বোল্ট ভেঞ্চারসের মালিক ডেভিড ব্লিটজার বিশ্বের বিভিন্ন ক্রীড়া দলে বিনিয়োগকারী হিসেবে পরিচিত। আর ব্ল্যাকস্টোন বৈশ্বিক বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনায় অন্যতম বৃহৎ প্রতিষ্ঠান। টাইমস অব ইন্ডিয়া গ্রুপও ভারতে একটি শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম সংস্থা। আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজি কলকাতা নাইট রাইডার্স তাদের ইতিহাসের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার আন্দ্রে রাসেলকে বিশেষ সম্মান জানিয়ে তার জার্সি নম্বর ১২ আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর ঘোষণা করেছে। ফলে ভবিষ্যতে আর কোনো ক্রিকেটার কেকেআরের হয়ে এই নম্বরের জার্সি পরবেন না। আইপিএল ২০২৬ শুরুর আগেই নেওয়া এই সিদ্ধান্তকে ফ্র্যাঞ্চাইজিটির পক্ষ থেকে ‘সম্মান ও কৃতজ্ঞতার প্রতীক’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত মৌসুমে রাসেলকে দল থেকে ছেড়ে দেওয়া হলেও, তিনি নিলামে না গিয়ে কেকেআরের ‘পাওয়ার কোচ’ হিসেবে যোগ দেন। এর মধ্য দিয়েই ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে তার খেলোয়াড়ি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে কেকেআরের হয়ে ১৪০টি ম্যাচে মাঠে নেমে রাসেল করেছেন ২,৬৫১ রান, স্ট্রাইক রেট ১৭৪.১৭—যা আইপিএলের ইতিহাসে অন্যতম সেরা। পাশাপাশি বল হাতে নিয়েছেন ১২৩টি উইকেট। তার অবদানেই দলটি জিতেছে ২০১৪ ও ২০২৪ সালের শিরোপা।

