প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবার চট্টগ্রাম সফরে আসছেন তারেক রহমান। আগামীকাল রোববার একদিনের সফরে কক্সবাজারের মহেশখালী ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেবেন তিনি। সফরের শুরুতে মহেশখালীর মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প ও মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (মিডা) কার্যক্রম পরিদর্শনের পর চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর ফটিকছড়িতে হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও সংগঠনটির কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন। পরে হাটহাজারীতে আল্লামা শাহ আহমদ শফীর কবর জিয়ারত এবং বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন।
সন্ধ্যায় নগরীর একটি পাঁচ তারকা হোটেলে চট্টগ্রাম বিএনপির সাংগঠনিক সভায় যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর। প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে তিন উপজেলায় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গ–সহযোগী সংগঠনের পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে জানান উপজেলা প্রতিনিধিরা।
বাঁশখালী : প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে বাঁশখালীতে বিএনপি ও অঙ্গ–সহযোগী সংগঠনের পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার উপজেলার চেচুরিয়া এস কে কেবি কনভেনশন হলে এ উপলক্ষে প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব লায়ন হেলাল উদ্দিন।
প্রস্তুতি সভায় লায়ন হেলাল উদ্দিন জানান, দীর্ঘ ২০ বছর পর প্রধানমন্ত্রীর বাঁশখালী আগমন আবেগ ও গৌরবের বিষয়। দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পাপ্পা বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফর বাঁশখালীর জন্য একটি ঐতিহাসিক আয়োজন। কর্মসূচির সফলতার জন্য দলীয় নেতাকর্মীদের ঐক্য, শৃঙ্খলা ও সাংগঠনিক সক্ষমতার পরিচয় দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সফরসূচি অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী রোববার সকাল ৯টায় মহেশখালীতে পৌঁছে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প পরিদর্শন শেষে দুপুর ১২টায় হেলিকপ্টারে বাঁশখালী উপজেলার বাহারছড়া সমুদ্রসৈকত সংলগ্ন এলাকায় যাবেন। সেখানে সামপ্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে ত্রাণ বিতরণ করবেন তিনি। একই অনুষ্ঠানে ১০০ গৃহহারা পরিবারের হাতে নতুন বাড়ির চাবি তুলে দেওয়ার কথা রয়েছে।
সেখানে মঞ্চ ও প্যান্ডেল নির্মাণসহ শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলছে। গতকাল শুক্রবার চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা অনুষ্ঠানস্থল, হেলিপ্যাড, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও নির্মাণাধীন ঘরগুলো পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন শেষে জেলা প্রশাসক সাংবাদিকদের বলেন, সাম্প্রতিক বন্যায় চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলার মধ্যে বাঁশখালী বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে জেলে সম্প্রদায়সহ মাটির ঘরে বসবাসকারী অনেক পরিবারের ঘর সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে বিধ্বস্ত হয়েছে। এসব পরিবারকে পুনর্বাসনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে নতুন ঘর নির্মাণ করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, বাঁশখালী পৌরসভা ও উপজেলার নয়টি ইউনিয়ন থেকে মোট ১০০টি পরিবারকে ঘর দেওয়ার জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। যেসব পরিবারের ঘর বন্যায় বিধ্বস্ত হয়েছে এবং নতুন করে ঘর নির্মাণের সামর্থ্য নেই, তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী প্রথমে স্বামীহারা এক নারীর হাতে নতুন ঘরের চাবি তুলে দেবেন। ওই নারী সন্তান নিয়ে বসবাস করেন। তাঁর হাতে চাবি তুলে দেওয়ার মধ্য দিয়ে প্রতীকীভাবে ১০০টি পরিবারের কাছে ঘর হস্তান্তর কার্যক্রম শুরু হবে।
ফটিকছড়ি : সফরসূচি অনুযায়ী, এদিন বাঁশখালী থেকে দুপুর ১টার দিকে ফটিকছড়িতে যাবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে নাজিরহাট পৌরসভার বাবুনগর এলাকার আল জামিয়াতুল ইসলামীয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় গিয়ে হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। এরপর হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের প্রায় ৫০ জন সিনিয়র নেতার সঙ্গে বিশেষ সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় সভায় অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর সফরকে অরাজনৈতিক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সংগঠনটির আমিরের মুখপাত্র ও নাতি মাওলানা রহমতুল্লাহ জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর শপথের সময় আমিরের সঙ্গে দেখা করার যে কথা দিয়েছিলেন, সেই কথা রাখতেই তাঁর ফটিকছড়ি সফর। সেখানে কোনো রাজনৈতিক সমাবেশ বা জনসভা হবে না; সৌজন্য সাক্ষাতের পর হেফাজতের জেলা ও কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীল নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় হবে। এ উপলক্ষে মাদ্রাসায় প্যান্ডেল ও মঞ্চ প্রস্তুত করা হয়েছে।
হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমির মাওলানা আইয়ুব বাবুনগরী জানান, সাক্ষাতের সময় ফটিকছড়িবাসীর সার্বিক কল্যাণে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরা হবে। এর মধ্যে ফটিকছড়িতে ৫০০ শয্যার বিশেষায়িত হাসপাতাল স্থাপন, চট্টগ্রাম শহর থেকে নাজিরহাট হয়ে রামগড় পর্যন্ত রেললাইন সমপ্রসারণ এবং চট্টগ্রাম–খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার দাবিও রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে ফটিকছড়ির উন্নয়নের মাইলফলক উল্লেখ করে এমপি সরোয়ার আলমগীর বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ফটিকছড়ি সফর আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দ ও গর্বের। ফটিকছড়ির সর্বস্তরের জনগণ উনাকে বরণ করতে উন্মুখ হয়ে আছে। ফটিকছড়ির স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন, শিক্ষাক্ষেত্রে উন্নতি সহ দীর্ঘদিনের দাবি উনার কাছে তুলে ধরা হবে। আমি বিশ্বাস করি, দেশরত্নের এই সফরের মধ্য দিয়ে ফটিকছড়ির অবহেলিত ও প্রান্তিক জনগণের ভাগ্য বদলে যাবে।
এমপি গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ফটিকছড়ি আসছেন এজন্য আমি আনন্দিত। সবচেয়ে বেশি আনন্দিত–তিনি মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সাথে দেখা করতে আসছেন। মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী আমার পরিবারেরই সদস্য। তিনি ফটিকছড়ি থেকে রিকশায় গিয়ে আমার ভাইয়ের জানাজা পড়িয়েছিল। বাবু নগর আমাদের আবেগের জায়গা। এটি রক্তের সম্পর্কের চেয়ে বেশি গভীর।
স্থানয়ী নেতাকর্মীরা জানান, ফটিকছড়ির স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিক্ষা ও বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন সমস্যা ও সম্ভাবনার কথা প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের পক্ষ থেকেও উন্নত চিকিৎসা, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি সামনে আসছে। বিশেষ করে নতুন বিদ্যুৎ গ্রিড স্থাপনের দাবিও রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে ফটিকছড়িতেও স্থানীয় বাসিন্দা, বিএনপি নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ–উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি মাদ্রাসামুখী সড়কগুলোতে ধোয়া–মোছা, পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতা এবং তোরণ নির্মাণের কাজ চলছে।
হাটহাজারী : ফটিকছড়ি থেকে সড়কপথে হাটহাজারীতে পৌঁছানোর কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। হাটহাজারীতে পৌঁছে আল–জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম মাদ্রাসায় গিয়ে হেফাজতে ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা আমির মরহুম আল্লামা শাহ আহমদ শফীর কবর জিয়ারত করবেন তিনি। এরপর মাদ্রাসা সংলগ্ন চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের ডাকবাংলোয় কিছু সময় বিশ্রাম নেবেন। প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে হাটহাজারীতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ডাকবাংলো পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন করা, রং–চুনকাম এবং যাতায়াতের সড়ক সংস্কারের কাজ করা হয়েছে। প্রধান ফটকও সাজানো হয়েছে। হাটহাজারী–ফটিকছড়ি আঞ্চলিক সড়কের অবৈধ স্থাপনা সরানোর কাজও চলছে।
হাটহাজারী সরকারি কলেজ মাঠে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন উপলক্ষে অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের পক্ষ থেকে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ৩০টি পরিবারকে ঘর নির্মাণের সহায়তা হিসেবে প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে দেওয়ার কথা রয়েছে। একই অনুষ্ঠানে ১৫ জন প্রতিবন্ধীকে শুভেচ্ছা উপহার হিসেবে প্রত্যেককে ১০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কর্মসূচিও রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠান ঘিরে হাটহাজারী কলেজ মাঠে মঞ্চ তৈরির কাজ চলছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা কাজ করছেন। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের পৃথক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সড়ক ব্যবস্থাপনা ও যানজট নিয়ন্ত্রণ, পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতা, আপ্যায়ন, স্বাস্থ্যসেবা, জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা, মাদ্রাসা ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের জন্য কর্মকর্তাদের দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে।
চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ড. জিয়াউদ্দিন জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীকে বরণ করে নিতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রস্তুতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম সফরের শেষ পর্যায়ে রোববার সন্ধ্যায় নগরীর রেডিসন ব্লুতে চট্টগ্রাম বিএনপির সাংগঠনিক সভায় যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। এরপর রাত ৯টা ২০ মিনিটে তাঁর ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেওয়ার কথা রয়েছে। একদিনের এই সফরকে ঘিরে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় প্রশাসনিক প্রস্তুতির পাশাপাশি দলীয় পর্যায়েও ব্যাপক কর্মতৎপরতা চলছে।