বাংলাদেশ রেলওয়েকে দেশের গণপরিবহনের মেরুদণ্ড বলা হলেও, প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী নিয়ে ট্রেনগুলোকে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার নেপথ্যের কারিগরদের গল্প আড়ালেই থেকে যায়। রেলের ইঞ্জিন বা লোকোমোটিভ সচল রাখতে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন দেশের ৪টি প্রধান রেলওয়ে কারখানার হাজারো প্রকৌশলী ও টেকনিশিয়ান। অত্যন্ত জটিল ও নিখুঁত এক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই কারখানাগুলোতে অকেজো ও ত্রুটিপূর্ণ ইঞ্জিনগুলোর ‘পুনর্জন্ম’ দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ রেলওয়েতে ব্রডগেজ ও মিটারগেজ উভয় ধরনের ইঞ্জিনকে সার্বক্ষণিক সচল রাখতে মূলত দুই স্তরের রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত ব্যবস্থা কাজ করে। প্রতিদিনের ছোটখাটো ত্রুটি সংশোধনের জন্য ঢাকা ডিজেল শপ এবং চট্টগ্রাম পাহাড়তলী শপের মতো আঞ্চলিক লোকোশেডগুলো চলতি মেরামত (Routine Repair) সম্পন্ন করে। তবে ইঞ্জিনের প্রধান ও ভারী মেরামতের জন্য দেশের একমাত্র ভরসা দিনাজপুরের পার্বতীপুর কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ কারখানা (KELCO)।
যেভাবে সচল হয় একটি অকেজো ইঞ্জিন
একটি রেল ইঞ্জিন সাধারণত ৩৪,০০০-এরও বেশি সূক্ষ্ম ও ভারী যন্ত্রাংশের সমন্বয়ে গঠিত। একটি ইঞ্জিন যখন দীর্ঘ সময় চলার পর বিকল হয়ে পড়ে বা নিয়মমাফিক নির্দিষ্ট বছর পর পর জেনারেল ওভারহোলিং (GOH)-এর জন্য কারখানায় আসে, তখন সেটি মেরামতে বেশ কয়েকটি কঠিন ও বৈজ্ঞানিক ধাপ পার করতে হয়:
* প্রাথমিক রোগ নির্ণয়: কারখানায় পৌঁছানোর পর আধুনিক ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা এবং আল্ট্রাসনিক টেস্টের মাধ্যমে ইঞ্জিনের মূল ফ্রেম বা চ্যাসিসে কোনো ফাটল আছে কি না তা নিখুঁতভাবে স্ক্যান করা হয়।
* খণ্ড খণ্ড করে খোলা ও কেমিক্যাল ওয়াশ: হাই-প্রেশার ওভারহেড ক্রেনের সাহায্যে ট্রেনের বিশাল ইঞ্জিনটিকে এর মূল বডি ও চাকা থেকে আলাদা করা হয়। এরপর সিলিন্ডার লাইনার, পিস্টন, ভালভ এবং ক্র্যাঙ্কশ্যাফ্ট পুরোপুরি খুলে বিশেষ কেমিক্যাল ওয়াশের মাধ্যমে দশকের পর দশক জমে থাকা কার্বন ও পোড়া মবিলমুক্ত করা হয়।
* যন্ত্রাংশ প্রতিস্থাপন ও চাকা মেরামত: ক্ষয়প্রাপ্ত চাকাগুলোকে অত্যাধুনিক ‘হুইল লেদ’ মেশিনে কেটে তার নিখুঁত আকৃতি ফিরিয়ে আনা হয়। ইঞ্জিনের মূল চালিকাশক্তি বা ট্র্যাকশন মোটরগুলোর রি-ওয়াইন্ডিং ও আর্মেচার পরীক্ষা করা হয় কারখানার ইলেকট্রিক্যাল শপে।
বিদেশি যন্ত্রাংশ নির্ভরতা ও বর্তমান চ্যালেঞ্জ
আধুনিক লোকোমোটিভগুলো মূলত ডিজেল-ইলেকট্রিক প্রযুক্তির, যা আমেরিকা ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো উন্নত দেশ থেকে আমদানি করা হয়। ফলে ইঞ্জিনের প্রধান খুচরা যন্ত্রাংশগুলো সম্পূর্ণ আমদানি-নির্ভর। বাংলাদেশ রেলওয়ে সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রোগ্রেস রেল (Progress Rail) এবং দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্ডাই রোটেম (Hyundai Rotem)-এর মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের তৈরি আধুনিক ইঞ্জিন বহরে যুক্ত করেছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে যন্ত্রাংশ আমদানিতে প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা অনেক সময় মেরামত প্রক্রিয়াকে মন্থর করে দেয়, যা রেলওয়ের জন্য একটি অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
রেলওয়ের সক্ষমতা আরও বাড়াতে সরকার পার্বতীপুর কেন্দ্রীয় কারখানার পাশেই আরও একটি নতুন ও সর্বাধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন লোকোমোটিভ ওয়ার্কশপ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রযুক্তিগত এই আধুনিকায়ন সম্পন্ন হলে দেশের অভ্যন্তরেই দ্রুততম সময়ে সব ধরনের ভারী মেরামত সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
একটি ত্রুটিহীন ইঞ্জিনের ওপর নির্ভর করে হাজারো যাত্রীর নিরাপত্তা। তাই মেরামত প্রক্রিয়া শেষে কড়া নজরদারিতে চলে ডায়নামোমিটারের মাধ্যমে ফুল-লোড টেস্ট এবং ট্র্যাকে পরীক্ষামূলক চালনা বা ট্রায়াল রান। সব পরীক্ষায় শতভাগ সফল হলেই কেবল একটি ইঞ্জিনকে লাইনে ট্রেন টানার জন্য সবুজ সংকেত বা ফিটনেস সার্টিফিকেট দেওয়া হয়। পর্দার আড়ালে থাকা এই রেল যোদ্ধাদের অক্লান্ত পরিশ্রমেই প্রতিদিন গতিময় থাকছে বাংলাদেশের রেললাইন।
একটি দেশের অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখতে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার বিকল্প নেই, আর তার বড় অংশ জুড়ে রয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। লোকোমোটিভ মেরামত ও আধুনিকায়নে আমাদের কারখানাসমূহের ক্রমবর্ধমান সক্ষমতা প্রমাণ করে যে, প্রতিকূলতার মাঝেও রেলওয়ে তার যাত্রীসেবার মান ধরে রাখতে বদ্ধপরিকর। নতুন কারখানা স্থাপন ও আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তির সমন্বয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে খুব দ্রুতই অতীতের সব সংকট কাটিয়ে এক নতুন দিগন্তে পদার্পণ করবে। পর্দার আড়ালে থাকা এই রেল যোদ্ধাদের হাত ধরেই গতিময় থাকবে বাংলাদেশের রেললাইন, সুগম হবে লাখো মানুষের নিরাপদ যাত্রা
মো. ইউসুফ
কলামিস্ট ও সমাজকর্মী