পাহাড়ের আঞ্চলিক সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠন জনসংহতি সমিতি (জেএসএস)-এর অব্যাহত চাঁদাবাজি, বর্বরতা ও হিংস্রতার বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফুসে উঠেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম। চাঁদা না পেয়ে এক অসহায় বাঙালি কৃষকের সাড়ে এক হাজারেরও বেশি ফলন্ত পেঁপেগাছ কেটে স্রেফ ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে জেএসএস ক্যাডাররা। এই ন্যাক্কারজনক ও জঘন্য কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে এবং জড়িত সন্ত্রাসীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে রাঙামাটি।
আজ ১ আগস্ট (শনিবার) সকালে রাঙামাটি শহরের বনরূপা সিএনজি স্টেশন চত্বরে পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র পরিষদ (পিসিসিপি) রাঙামাটি জেলা শাখার উদ্যোগে এক বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশ ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে শহরের কাঠালতলী থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে বনরূপা সিএনজি স্টেশন চত্বরে সমাবেশে মিলিত হয় নেতাকর্মীরা।
পিসিসিপি রাঙামাটি জেলা সভাপতি তাজুল ইসলাম তাজের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেনের সঞ্চালনায় সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পিসিসিপি কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদ সদস্য মো. হাবীব আজম। এসময়ে আরো উপস্থিত ছিলেন পিসিএনপি’র রাঙামাটি জেলা সাংগঠনিক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, সহ- সাধারণ সম্পাদক মাওলানা ইব্রাহিম, সহ-সমাজ সেবা বিষয়ক সম্পাদক মাহবুব আলম সহ বিভিন্ন নেতৃবৃন্দ।
সমাবেশে বক্তারা অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে জানান, রাঙামাটির আসামবস্তি এলাকার ব্রাহ্মণ টিলায় দীর্ঘদিন ধরে হাড়ভাঙ্গা খাটুনি দিয়ে পেঁপে বাগান গড়ে তুলেছিলেন কৃষক খলিলুর রহমান। কিন্তু জেএসএস-এর কথিত অর্থ সংগ্রাহক (কালেক্টর) শান্তি রঞ্জন চাকমা তাঁর কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। খলিলুর রহমান এই অন্যায্য চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে গত বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) দিবাগত রাতের আঁধারে জেএসএস সন্ত্রাসীরা পরিকল্পিতভাবে আক্রমণ চালিয়ে বাগানের প্রায় ১,৪০০টি ফলন্ত পেঁপেগাছ কেটে মাটিতে মিশিয়ে দেয়। এক রাতেই নিঃস্ব হয়ে যান এই শ্রমজীবী কৃষক।
এর আগে জেএসএস-এর আরেক ক্যাডার দীপেন চাকমা লংগদুতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হলে চরম বেপরোয়া হয়ে ওঠে এই শান্তি রঞ্জন চাকমা। সে বেশ কিছুদিন ধরেই ওই এলাকায় চাঁদাবাজির রাজত্ব এবং সাধারণ মানুষদের প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে আসছিল।
নিজের রক্তজল করা কষ্টের ফসল হারিয়ে কান্নাভেজা কণ্ঠে মানববন্ধনে অংশ নেন ভুক্তভোগী কৃষক খলিলুর রহমান। তিনি বলেন, “পাঁচ বছরের জন্য লিজ নেওয়া জমিতে ১৮শ পেঁপেগাছ লাগিয়েছিলাম। জেএসএস সন্ত্রাসীদের ১০ লাখ টাকা চাঁদা না দেওয়ায় এক নিমিষেই তারা আমার সব স্বপ্ন শেষ করে দিল। ১৪শ গাছ কেটে আমাকে মানসিক ও অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দিয়েছে। এখন আমাকে প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে। আমি প্রশাসনের কাছে এর বিচার এবং জেএসএস সন্ত্রাসীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার চাই।”
সমাবেশে বক্তারা অভিযোগ করেন, লংগদু উপজেলার ৪ নম্বর বগাচত্বর ইউনিয়নের শিবেরআগা পরিত্যক্ত পুলিশ ক্যাম্প এলাকায় জেএসএস-এর অর্থবিষয়ক সম্পাদক নতুনা চাকমার একটি দোকানঘরকে আস্তানা বানিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজি ও অপকর্ম চালিয়ে আসছে এই চক্রটি। পাহাড়ে জেএসএস-এর এই বর্বরতায় আজ পাহাড়ি-বাঙালি উভয় জনগোষ্ঠীর জীবন অতিষ্ঠ।
সমাবেশ থেকে বক্তারা প্রশাসনের কাছে কয়েকটি জোর দাবি জানান: সন্ত্রাসীকে দ্রুত গ্রেপ্তার: কৃষক খলিলুর রহমানের বাগান ধ্বংসকারী জেএসএস সন্ত্রাসী শান্তি রঞ্জন চাকমাসহ জড়িত মূল হোতাদের অবিলম্বে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
ক্ষতিপূরণ: নিঃস্ব হয়ে যাওয়া ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক খলিলুর রহমানকে সরকারিভাবে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে।
ক্যাম্প পুনর্স্থাপন: পাহাড় থেকে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী আস্তানা চিরতরে উপড়ে ফেলতে লংগদুর শিবেরআগা পরিত্যক্ত স্থানে পুনরায় স্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করতে হবে।
জিরো টলারেন্স: সমগ্র রাঙামাটি জেলা জুড়ে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের চাঁদাবাজি ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর থেকে কঠোরতর অবস্থান নিতে হবে।
বক্তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, পাহাড়ে জেএসএস-এর এই সন্ত্রাসী রাজত্ব আর বরদাস্ত করা হবে না। মেহনতি মানুষের ওপর এই জুলুম বন্ধ না হলে পাহাড়ি-বাঙালি এক হয়ে রাজপথে আরও কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।