উত্তরাঞ্চলের সাহিত্য, নাটক, সংগীত ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র ছিল লালমনিরহাট জেলা শহরের রামকৃষ্ণ মিশন রোডে অবস্থিত ১২১ বছরের ঐতিহ্যবাহী এম. টি. হোসেন ইনস্টিটিউট।
বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রায় ২ একর ৭৩ শতক জমির ওপর নির্মিত বিস্তৃত ঐতিহাসিক স্থাপনাটি একসময় জেলার অন্যতম সিনেমা হল হিসেবেও পরিচিত ছিল। তবে দীর্ঘদিনের অবহেলা, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে বর্তমানে এটি ধ্বংসের মুখে পড়েছে। দ্রুত সংরক্ষণ ও সংস্কার উদ্যোগ না নিলে জেলার গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি মূল্যবান অধ্যায় হারিয়ে যাবে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ভবনটির দরজা-জানালা, টিনের ছাউনি এবং অধিকাংশ কাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। বিভিন্ন স্থানে দেয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে, ইট খসে পড়েছে এবং চারপাশ আগাছায় ভরে পরিত্যক্ত পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় ভবনটির অস্তিত্ব নিয়েই শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের প্রবীণ বাসিন্দা আশরাফ হোসেন ও টুলু মিয়া বাসসকে জানান, একসময় ইনস্টিটিউটটিতে ঘূর্ণায়মান মঞ্চ, সমৃদ্ধ পাঠাগার, নাটক, সংগীতানুষ্ঠান, সাহিত্য সভা ও সিনেমা প্রদর্শনের নিয়মিত আয়োজন হতো। এসব অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল এমনকি তৎকালীন ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকেও কবি, সাহিত্যিক ও নাট্যব্যক্তিত্বরা অংশ নিতেন।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৯০৫ সালে ব্রিটিশ রেলওয়ে কর্মকর্তাদের উদ্যোগে ‘ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট’ নামে প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ের ডিস্ট্রিক্ট সুপারিনটেনডেন্ট পিয়ার্সের নামে এর নামকরণ করা হয় ‘পিয়ার্স ইনস্টিটিউট’। পরবর্তীতে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সমর্থক হিসেবে পরিচিত রেলওয়ের চিফ টিকিট এক্সামিনার এম. টি. হোসেনের অকাল মৃত্যুর পর শ্রমিক-কর্মচারীদের দাবির মুখে ১৯৩৪ সালে তার নামেই প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হয়।
জেলার প্রবীণ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, গীতিকার ও সুরকার সত্যেন্দ্রনাথ রায় বাসসকে বলেন, স্বাধীনতার পরও দীর্ঘদিন এম. টি. হোসেন ইনস্টিটিউট এ অঞ্চলের সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র ছিল। এখানে নিয়মিত সিনেমাও প্রদর্শিত হতো। তবে দীর্ঘদিনের অবহেলা ও সময়ের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠানটি তার ঐতিহ্য হারিয়েছে।
তিনি প্রতিষ্ঠানটির সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সরকারের, বিশেষ করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলুর সুদৃষ্টি কামনা করেন।
সাহিত্যিক নিশিকান্ত রায় বাসসকে বলেন, রেলওয়ের অসাধু কিছু কর্মকর্তা এবং স্থানীয় ভূমিদস্যুরা বিভিন্ন সময়ে প্রতিষ্ঠানের সম্পদ লুটপাট ও জমি দখলের চেষ্টা করেছে। তবে সাহিত্য-সাংস্কৃতিক কর্মী ও সচেতন নাগরিকদের আন্দোলনের কারণে সেই প্রচেষ্টা কখনো সফল হয়নি।
বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের ভাওয়াইয়া সংগীতের প্রবীণ শিল্পী তাজুল চৌধুরী বাসসকে বলেন, ‘এটি শুধু একটি ভবন নয়, লালমনিরহাটের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দ্রুত সংরক্ষণ ও সংস্কার করা না হলে জেলার একটি মূল্যবান ঐতিহ্য চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে।’
জেলা কালচারাল অফিসার মো. হামিদুর রহমান বাসসকে বলেন, শতবর্ষী এই স্থাপনাটি সংস্কার করে পুনরায় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্য উন্মুক্ত করা জরুরি। এ লক্ষ্যে দ্রুত সংরক্ষণ ও সংস্কার উদ্যোগ নেওয়ার জন্য তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভাগীয় এস্টেট অফিসার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. মনজুর হোসেন বাসসকে বলেন, ‘স্থাপনাটির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে আমরা অবগত। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংরক্ষণ ও সংস্কারের বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
জেলা প্রশাসক মুহ. রাশেদুল হক প্রধান বাসসকে বলেন, ‘ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
সংস্কৃতি কর্মীদের মতে, এম. টি. হোসেন ইনস্টিটিউট শুধু একটি পুরোনো ভবন নয়, এটি লালমনিরহাটের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অন্যতম প্রতীক। তাদের দাবি, সরকার দ্রুত সংরক্ষণ ও সংস্কারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিকে পুনরায় সাহিত্য, নাটক, সংগীত এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হোক। অন্যথায় জেলার ইতিহাস ও সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।