বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬, ০৮:২৫ পূর্বাহ্ন

বাঁশখালীতে বিদ্যুৎ নেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা, বিল দ্বিগুণ-তিন গুণ

ডেস্ক রিপোর্ট
সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬

চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে দীর্ঘ সময়ের লোডশেডিংয়ের পাশাপাশি অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে গ্রাহকদের মধ্যে। তাদের অভিযোগ, দিনের বড় একটি সময় বিদ্যুৎ না থাকলেও গত কয়েক মাস ধরে অনেক গ্রাহকের হাতে স্বাভাবিকের তুলনায় দ্বিগুণ, তিন গুণ এমনকি তারও বেশি বিল দেওয়া হচ্ছে। কারও ক্ষেত্রে পুরোনো পরিশোধিত বিল বকেয়া দেখানো হয়েছে, আবার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকা অবস্থাতেও মিটারে ইউনিট দেখিয়ে বিল করার অভিযোগ উঠেছে।

উপজেলার বিভিন্ন এলাকার গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, লোডশেডিংয়ের কারণে শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষিকাজ ও ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে রাতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় শিশু, বয়স্ক, অসুস্থ ও গর্ভবতী নারীদের ভোগান্তি বাড়ছে। একই সঙ্গে অস্বাভাবিক বিল হাতে পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন গ্রাহকেরা।

বাঁশখালী পল্লী বিদ্যুৎ জোনাল অফিস সূত্রে জানা গেছে, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর আওতায় উপজেলায় গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার। চারটি অভিযোগ কেন্দ্র, একটি সাব-জোনাল অফিস ও একটি জোনাল অফিসের মাধ্যমে এসব গ্রাহককে সেবা দেওয়া হয়। এসব কার্যালয়ে দুইজন এজিএম ও একজন ডিজিএমসহ প্রায় ১৫০ জন কর্মচারী এবং চুক্তিভিত্তিক ৭৫ জন কর্মী রয়েছেন।

পৌর এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ মিজানুল হক বলেন, তার মাসিক বিদ্যুৎ বিল সাধারণত ৫৫০ থেকে ৭০০ টাকার মধ্যে থাকে। তবে চলতি মাসে বিল এসেছে ২ হাজার ৩০০ টাকা। তার অভিযোগ, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে তার দোকান বন্ধ এবং বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন। এরপরও নিয়মিত বিল দেওয়া হচ্ছে।

মিজানুল হক বলেন, ‘বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকা অবস্থায়ও গত সাত-আট মাস ধরে ২০, ৩০ ও ৪০ ইউনিট করে বিল দেখানো হয়েছে। জুন মাসেও ১০ ইউনিটের বিল করা হয়েছে। অথচ দোকান বন্ধ।’

গন্ডামারা ইউনিয়নের পূর্ব বড়ঘোনা এমদাদ মিয়াপাড়া এলাকার গ্রাহক মোহাম্মদ নুর হোসেন বলেন, তার মাসিক বিল সাধারণত ৩৫০ টাকা। কিন্তু আগস্ট মাসে বিল এসেছে ১ হাজার ৩৮০ টাকা।

বাহারছড়া এলাকার মোহাম্মদ মনছুর আলম বলেন, তার বাড়িতে দুটি লাইট, দুটি ফ্যান ও একটি ফ্রিজ রয়েছে। মাসে সাধারণত ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকা বিল আসে। এবার তাকে ৬ হাজার ৫৩৬ টাকার বিল দেওয়া হয়েছে।

মনছুর আলমের অভিযোগ, ‘এ বিষয়ে জানতে তিনি গুনাগরী সাবস্টেশনে গেলে কর্মকর্তারা মিটারে যে রিডিং এসেছে, সে অনুযায়ী বিল করা হয়েছে বলে জানান। অভিযোগের বিষয়ে সন্তোষজনক কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে বিল পরিশোধ না করলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার কথা বলা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।’

দক্ষিণ জলদী এলাকার গ্রাহক সামশুল আলম বলেন, ‘তার বাড়িতে দুটি ফ্যান, একটি ফ্রিজ ও একটি টেলিভিশন রয়েছে। সাধারণত মাসে ৪৫ থেকে ৬০ ইউনিটের মতো বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়। কিন্তু আগস্ট মাসের বিলে ২০০ ইউনিট দেখানো হয়েছে।’

রঙ্গিয়াঘোনা এলাকার তৈয়ব বলেন, ‘তার মাসিক বিল সাধারণত ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা। আগস্ট মাসে তাকে ২ হাজার ২৫৬ টাকার বিল দেওয়া হয়েছে। তার দাবি, মিটারে ১ হাজার ১০৩ ইউনিট জমা থাকলেও বিলে ১ হাজার ১৪২ ইউনিট দেখানো হয়েছে।’

তৈয়ব বলেন, ‘মিটারের সঙ্গে হিসাব না মেলায় বিষয়টি জানাতে পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে গেলে আমার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়। উল্টো মামলা-মোকদ্দমার ভয় দেখানো হয়েছে।’

লোডশেডিং নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন গ্রাহকেরা। বাঁশখালী পল্লী বিদ্যুৎ গ্রাহক-সংশ্লিষ্ট একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ছনুয়া এলাকার মো. হাবিব উল্লাহ মিসবাহ লিখেছেন, ‘বাঁশখালীর বিদ্যুৎ হোমিও ওষুধের মতো হয়ে গেছে। দুই ঘণ্টা পর পর দুই ফোঁটা করে দেয়।’

গ্রাহকদের অভিযোগ, কোনো কোনো এলাকায় দিনে ও রাতে মিলিয়ে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। বিশেষ করে মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত ঘন ঘন বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করায় ভোগান্তি বাড়ছে।

জলদী মিয়ার বাজার এলাকার ব্যবসায়ী মোবারক হোসেন আসিফ বলেন, ‘বিদ্যুৎ না থাকার কারণে বিভিন্ন বাসা, দোকান ও মার্কেটে চুরির ঘটনাও বেড়েছে বলে স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। দীর্ঘ সময় রাতের লোডশেডিংয়ের কারণ জানতে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা দাবি করেছেন।’

লোডশেডিংয়ের কারণে কৃষি ও চিকিৎসায়ও প্রভাব পড়েছে।  কৃষকেরা বলছেন, নিয়মিত বিদ্যুৎ না থাকায় সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এতে আমন ধানসহ অন্যান্য কৃষিকাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা মুমিনুল হক বলেন, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় হাসপাতালে ভর্তি রোগী ও তাদের স্বজনেরা দুর্ভোগে পড়ছেন।

তিনি বলেন, ‘প্রচণ্ড গরমে শিশু ও বয়স্ক রোগীরা বেশি কষ্ট পাচ্ছেন। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় হাসপাতালের স্বাভাবিক কার্যক্রমেও সমস্যা হচ্ছে।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘জুন, জুলাই ও আগস্ট—এই তিন মাসে অনেক গ্রাহককে অতিরিক্ত বিল দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তার দাবি, দিনে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অনেক এলাকায় তিন-চার ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ করা না হলেও বিলের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।’

তবে বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতির কারণে লোডশেডিং হচ্ছে বলে জানিয়েছে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহ না করে বিলের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার অভিযোগের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন বাঁশখালী পল্লী বিদ্যুৎ জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) আতিকুর রহমান।

তিনি বলেন, জুন ও জুলাই মাসে গরম বেশি থাকায় বিদ্যুতের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় কিছু গ্রাহকের বিল বেশি আসতে পারে। তবে মিটারের রিডিংয়ের সঙ্গে মিল থাকা অবস্থায় বিল অস্বাভাবিক বলা যাবে না।

লোডশেডিংয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, চাহিদার তুলনায় কম বিদ্যুৎ বরাদ্দ পাওয়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বাঁশখালীতে বর্তমানে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৪২ মেগাওয়াট। বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে ১৮ থেকে ২০ মেগাওয়াট। রাত ১১টার পর সরবরাহ আরও কমে ৮ থেকে ৯ মেগাওয়াটে নেমে আসে।

ডিজিএম বলেন, ‘বিদ্যুৎ বিল অস্বাভাবিক আসার কোনো সুযোগ নেই। গ্রাহক যতটুকু ব্যবহার করেন, সে অনুযায়ীই বিল আসে। মিটারের রিডিংয়ের সঙ্গে বিলের রিডিংয়ের মিল থাকলে কিছু করার নেই। তবে মিটারের সঙ্গে রিডিংয়ের মিল না থাকলে গ্রাহকের অভিযোগ অবশ্যই শুনব।’


এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ