কালের সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে কুমিল্লার শালবন বৌদ্ধ বিহার। ধ্বংসাবশেষের ইট-পাথর আর মাটির নিচ থেকে উঠে আসা নানা প্রত্ননিদর্শন যেন বলে দেয় হাজার বছরের সমৃদ্ধ ইতিহাসের কথা। প্রাচীন বৌদ্ধ সভ্যতা, শিক্ষা, ধর্মচর্চা ও স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন হিসেবে শালবন বিহার এখন দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা। কুমিল্লা শহর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার পশ্চিমে কোটবাড়ি এলাকায় লালমাই-ময়নামতি পাহাড়শ্রেণির মাঝামাঝি স্থানে অবস্থিত শালবন বিহার। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, একসময় বিহারটির চারপাশে শাল-গজারির ঘন বন ছিল। সেই থেকেই এর নাম হয় শালবন বিহার।
ধারণা করা হয়, খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতাব্দীর শেষ থেকে অষ্টম শতাব্দীর প্রথম ভাগে দেববংশের চতুর্থ রাজা শ্রীভবদেব এই বৌদ্ধ বিহার নির্মাণ করেন। পরবর্তী সময়ে বিহারটি একাধিকবার নির্মাণ ও সংস্কারের মধ্য দিয়ে বিস্তৃত হয়। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় এর ছয়টি নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণ পর্যায়ের তথ্য পাওয়া গেছে। বিশাল চতুষ্কোণ আকৃতির বিহারটির প্রতিটি বাহু প্রায় ১৬৭ দশমিক ৭ মিটার দীর্ঘ। চারপাশের বেষ্টনী দেয়াল প্রায় পাঁচ মিটার পুরু। বিহারের ভেতরের চারদিকে সারিবদ্ধ কক্ষ এবং মাঝখানে রয়েছে একটি ক্রুশাকৃতি কেন্দ্রীয় মন্দির। প্রত্নতাত্ত্বিক সূত্রে বিহারে ১১৫টি ভিক্ষুকক্ষ থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব কক্ষেই বৌদ্ধ ভিক্ষুরা বসবাস, ধর্মচর্চা ও জ্ঞানচর্চা করতেন। বিহারে প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য ছিল উত্তর দিকে একটি প্রধান প্রবেশপথ। প্রতিটি কক্ষের সামনে ছিল বারান্দা। কক্ষের দেয়ালে থাকা কুলুঙ্গিতে প্রতিমা, প্রদীপসহ বিভিন্ন ধর্মীয় সামগ্রী রাখা হতো বলে ধারণা করা হয়। বিহারের অভ্যন্তরে ভিক্ষুদের সমবেত হওয়া ও খাবারের জন্য ব্যবহৃত একটি বড় হলঘরেরও অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।
খননকাজে শালবন বিহার থেকে উঠে এসেছে প্রাচীন বাংলার ইতিহাসের বহু গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। পাওয়া গেছে তাম্রলিপি, স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা, পোড়ামাটির ফলক বা টেরাকোটা, সিলমোহর, ব্রোঞ্জ ও মাটির তৈরি বিভিন্ন মূর্তি। এসব প্রত্ননিদর্শন থেকে তৎকালীন মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস, শিল্পচর্চা, জীবনযাপন ও সাংস্কৃতিক বিকাশ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। শুধু একটি বিহার নয়, পুরো ময়নামতি-লালমাই অঞ্চলই প্রাচীন বৌদ্ধ সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এ অঞ্চলে খ্রিষ্টীয় অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে গড়ে ওঠা বহু প্রত্নস্থানের সন্ধান পাওয়া গেছে। শালবন বিহার সেই বিশাল প্রত্নভাণ্ডারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
শালবন বিহারের পাশেই রয়েছে ময়নামতি জাদুঘর। ১৯৬৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই জাদুঘরে লালমাই-ময়নামতি অঞ্চলের বিভিন্ন প্রত্নস্থল থেকে উদ্ধার করা মূর্তি, টেরাকোটা ফলক, মুদ্রা, তাম্রলিপি ও অন্যান্য পুরাকীর্তি সংরক্ষণ করা হয়েছে। ফলে শালবন বিহার দেখতে আসা দর্শনার্থীরা একই সঙ্গে প্রাচীন সভ্যতার নানা নিদর্শন দেখার সুযোগ পান। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের পাশাপাশি শালবন বিহার এখন কুমিল্লার অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র। বিশেষ করে শীত মৌসুমে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটক, শিক্ষার্থী ও পরিবার নিয়ে দর্শনার্থীরা এখানে ভিড় করেন। প্রাচীন স্থাপত্যের পাশাপাশি সবুজে ঘেরা পরিবেশও পর্যটকদের আকৃষ্ট করে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাগুলো সংরক্ষণে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, গবেষণা এবং দর্শনার্থীদের সচেতনতা জরুরি। কারণ, শালবন বিহারের প্রতিটি ইট ও ধ্বংসাবশেষ শুধু একটি স্থাপনার অংশ নয়—এসবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এ অঞ্চলের বহু শত বছরের ইতিহাস।
হাজার বছরের পুরোনো এই ধ্বংসাবশেষ আজও যেন অতীতের গল্প বলে চলেছে। একসময় যেখানে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের ধর্মচর্চা ও জ্ঞানার্জনের কেন্দ্র ছিল, সময়ের পরিক্রমায় সেই শালবন বিহার এখন পরিণত হয়েছে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক ও পর্যটনস্থলে। ইতিহাসের সেই গৌরব ধরে রাখতে প্রয়োজন যথাযথ সংরক্ষণ ও গবেষণা।