জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর এক দিনের মধ্যেই দেশের সড়ক পরিবহন খাতে সরাসরি প্রভাব পড়েছে। দূরত্ব ও পণ্যভেদে ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও কন্টেনার মুভারের ভাড়া একেক ট্রিপে ৩ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে। চট্টগ্রাম–ঢাকা রুটসহ বিভিন্ন দূরপাল্লার পথে পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমদানি–রপ্তানি পণ্যের পরিমাণ কম থাকায় একদিকে খালি গাড়ি ফিরছে, অন্যদিকে জ্বালানি ব্যয় বেড়েছে–দুই দিকের চাপ সামলাতে বর্তমান বাড়তি ভাড়াও যথেষ্ট নয়। ফলে সামনে ভাড়া আরও বাড়তে পারে।
সরকারি সিদ্ধান্তে নতুন বাসভাড়া নির্ধারণের আগেই চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন রুটে যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। কোনো কোনো রুটে ৩ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বেশি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় চাপ তৈরি হয়েছে বন্দরকেন্দ্রিক পণ্য পরিবহনে। চট্টগ্রাম বন্দরের বার্থ অপারেটররা বিদ্যমান চুক্তির দর পুনর্নির্ধারণের দাবি জানিয়ে গতকাল সোমবার বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি দিয়েছেন। বার্থ অপারেটরস শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরস অ্যান্ড টার্মিনাল অপারেটরস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের দেওয়া ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, বর্তমান জ্বালানি মূল্যে বিদ্যমান চুক্তির দরে কন্টেনার হ্যান্ডলিংসহ আনুষঙ্গিক কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। জ্বালানি ব্যয়ের সঙ্গে চুক্তির দর সমন্বয় করে নতুন রেট নির্ধারণের জন্য জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ারও অনুরোধ জানানো হয় চিঠিতে।
বার্থ অপারেটরদের হিসাবে, ২০২২ সালের জানুয়ারিতে বর্তমান চুক্তির জন্য দরপত্র আহ্বানের সময় ডিজেলের দাম ছিল লিটারপ্রতি ৮০ টাকা। সর্বশেষ ২০ টাকা বৃদ্ধির পর তা দাঁড়িয়েছে ১৩৫ টাকায়। দরপত্র দাখিলের সময়ের তুলনায় ডিজেলের দাম বেড়েছে ৫৫ টাকা বা প্রায় ৬৯ শতাংশ। এর মধ্যে ২০২২ সালের আগস্টে একবার ৩৪ টাকা এবং পরে আরও ১৫ টাকা বাড়ানো হয়েছিল। অপারেটররা বলছেন, আগের দফাগুলোতেও চুক্তির দর সমন্বয়ের আবেদন করা হলেও তা কার্যকর হয়নি।
কন্টেনার হ্যান্ডলিংয়ের প্রায় প্রতিটি ধাপই জ্বালানি ও পরিবহনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। জাহাজ থেকে কন্টেনার নামানো, ইয়ার্ডে নেওয়া, এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরানো এবং নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছানোর কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন যান ও যন্ত্রপাতির বড় অংশ ডিজেল নির্ভর। ফলে জ্বালানির দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্দর পরিচালনার ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে বলে দাবি অপারেটরদের। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব বেসরকারি আইসিডিগুলোতেও পড়বে বলে সূত্র মন্তব্য করেছে।
সড়ক পরিবহন খাতের চিত্রও একই। চট্টগ্রাম–ঢাকা রুটে এর আগে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর একেক ট্রিপে ট্রাকের ভাড়া ৭ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছিল। এবার নতুন করে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ায় পরিবহন মালিকরা আবারও ভাড়া সমন্বয় করছেন। পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, দীর্ঘ দূরত্বের ট্রিপে অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয়, সড়কের টোল ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ের সঙ্গে খালি গাড়ি ফেরার খরচও ভাড়ার ওপর চাপ তৈরি করছে।
একজন শীর্ষস্থানীয় পরিবহন মালিক বলেন, আমদানি রপ্তানির পণ্য নেই বললেই চলে। পরিবহনের কাজ বিশ শতাংশে নেমে এসেছে। এতে করে গত কিছুদিন ধরে নির্ধারিত ভাড়ার বহু কমে পরিবহন মালিকেরা ভাড়া টানতে বাধ্য হচ্ছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর গতকাল থেকে ভাড়া ট্রিপ প্রতি তিন থেকে দশ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। তবে এই ভাড়া আরো বাড়বে বলেও তারা উল্লেখ করেন। অপর একজন পরিবহন মালিক বলেছেন, চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা যাতায়তে একটি ট্রাকের কমপক্ষে তিন হাজার টাকা খরচ বেড়ে গেছে।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি বাস ভাড়ার ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে। নতুন জ্বালানি মূল্য কার্যকর হওয়ার পর গতকাল থেকেই চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন রুটে আগের চেয়ে বেশি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ২ নম্বর গেট থেকে আগ্রাবাদ রুটে ১৫ টাকার পরিবর্তে কোনো কোনো বাসে ২০ টাকা, দুই নম্বর গেট থেকে অঙিজেন পর্যন্ত ১০ টাকার ভাড়া ১৫ টাকা, মুরাদপুর–আন্দরকিল্লা রুটে ১৫ টাকার পরিবর্তে ১৮ থেকে ২০ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এভাবে শহরের প্রায় প্রতিটি রুটে ভাড়া বেড়ে গেছে। সিএনজি গ্যাসে চলাচল করে এমন বাস ও হিউম্যান হলারগুলোও যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া আদায় করছে। সরকারি নতুন ভাড়ার চার্ট নির্ধারণের আগে এভাবে বাড়তি ভাড়া আদায় নিয়ে যাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
দেশের সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম গতকাল থেকে নতুন করে লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। নতুন দরে ডিজেল ১৩৫, কেরোসিন ১৫৫, পেট্রোল ১৬০ এবং অকটেন ১৬৫ টাকা হয়েছে। এর আগে ডিজেল ১১৫, কেরোসিন ১৩৫, পেট্রোল ১৪০ এবং অকটেন ১৪৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছিল। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও শিপিং ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে এই মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত মূল্য সমন্বয় না করায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা লোকসান করেছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধির চাপও বেড়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব গাড়ি ভাড়ার পাশাপাশি আমদানি করা কাঁচামাল, শিল্পপণ্য, খাদ্যপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছাতে পরিবহন খরচ বাড়বে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে আসা আমদানি পণ্য দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পরিবহনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ব্যয় শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামে যুক্ত হবে। একইসাথে রপ্তানি পণ্য কারখানা বা ডিপো থেকে বন্দরে নেওয়ার খরচ বাড়ায় রপ্তানিকারকরাও বাড়তি চাপের মুখে পড়বেন।
আমদানি–রপ্তানি বাণিজ্যের গতি স্বাভাবিক না থাকলে বাড়তি জ্বালানি ব্যয়ের পুরোটা ভাড়ায় সমন্বয় করা সম্ভব হবে না। আর পণ্য পরিবহনের চাহিদা না বাড়লে গাড়ির মালিকদের খরচ পুষিয়ে নিতে ভাড়া আরও বাড়ানোর চাপ তৈরি হবে। ফলে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব একদিকে পরিবহন খরচ, অন্যদিকে বন্দর ও লজিস্টিক ব্যয় হয়ে শেষ পর্যন্ত পণ্যের বাজারদরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে পণ্যমূল্য এবং মূল্যস্ফিতি বেড়ে যাওয়ারও আশঙ্কা করেছেন সংশ্লিষ্টরা