বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:২১ পূর্বাহ্ন

মানবতার সেবায় এক অনন্য আলোকবর্তিকা: মাদার তেরেসার ১১৬তম জন্মবার্ষিকী

মোঃ আরিফুল ইসলাম (খাগড়াছড়ি জেলা প্রতিনিধি)
বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬

মানবতার সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করা এক অনন্য নাম মাদার তেরেসা। দরিদ্র, অসুস্থ, অনাথ ও সমাজের প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি বিশ্বজুড়ে মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁর জীবন ও কর্ম আজও মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও সেবার অনুপ্রেরণা জাগায়।

মাদার তেরেসার জন্ম ১৯১০ সালের ২৬ আগস্ট তৎকালীন অটোমান সাম্রাজ্যের স্কপিয়েতে। তাঁর জন্মনাম ছিল অ্যাগনেস গনঝে বোজাঝিউ। পরবর্তী জীবনে ভারতে এসে তিনি দরিদ্র ও অসহায় মানুষের সেবায় নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিয়োজিত করেন। ১৯৫০ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘মিশনারিজ অব চ্যারিটি’, যা পরবর্তীতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানবসেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে।

জীবনের শেষ পর্যায়েও তিনি সেবাকাজ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি। গুরুতর স্বাস্থ্যগত সমস্যার মধ্যেও সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনা ও দরিদ্র মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা অব্যাহত রাখেন। ১৯৯৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর কলকাতায় ৮৭ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। ভারত সরকার তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ বিদায় জানায়। কলকাতার মাদার হাউসে তাঁর সমাধি আজও মানুষের প্রার্থনা ও শ্রদ্ধা নিবেদনের অন্যতম স্থান।

মৃত্যুর পরও মাদার তেরেসার প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা আরও বিস্তৃত হয়। ২০০৩ সালে পোপ জন পল দ্বিতীয় তাঁকে ‘ধন্য’ ঘোষণা করেন। এরপর ২০১৬ সালের ৪ সেপ্টেম্বর পোপ ফ্রান্সিস তাঁকে ক্যাথলিক চার্চের সাধু হিসেবে ঘোষণা করেন। তখন থেকে তিনি ‘সেন্ট তেরেসা অব কলকাতা’ নামে পরিচিতি লাভ করেন।

তবে তাঁর উত্তরাধিকার নিয়ে আলোচনা করতে গেলে শুধু প্রশংসার দিকটি নয়, সমালোচনাগুলোকেও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। তাঁর কাজের পদ্ধতি, দাতব্য কার্যক্রম এবং ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিতর্ক ও সমালোচনা হয়েছে। নোবেল পুরস্কারের জীবনীমূলক তথ্যেও তাঁর কাজের পাশাপাশি এসব বিতর্কের উল্লেখ রয়েছে। ফলে মাদার তেরেসার জীবন মূল্যায়নে প্রশংসা ও সমালোচনা—উভয় দিকই ইতিহাসের আলোকে বিবেচনা করা জরুরি।

তবুও তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সবসময় বড় কোনো সামর্থ্যের প্রয়োজন হয় না। একজন অসুস্থ মানুষের পাশে বসা, একজন ক্ষুধার্তকে খাবার দেওয়া, একজন পরিত্যক্ত মানুষকে মর্যাদা দেওয়া কিংবা একজন অনাথ শিশুর মাথায় স্নেহের হাত রাখাও মানবতার বড় পরিচয় হতে পারে।

আজকের পৃথিবীতে যুদ্ধ, সংঘাত, দারিদ্র্য, বৈষম্য, নিঃসঙ্গতা ও সামাজিক বিভাজন এখনো অসংখ্য মানুষের জীবনকে বিপন্ন করে। এমন বাস্তবতায় মাদার তেরেসার জীবন ও মানবসেবার আদর্শ নতুন করে স্মরণ করার গুরুত্ব রয়েছে। তাঁর ধর্মীয় বিশ্বাস বা কাজের পদ্ধতির সঙ্গে সবাই একমত নাও হতে পারেন; কিন্তু অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং মানুষের মর্যাদাকে গুরুত্ব দেওয়ার বার্তা বিশ্বজুড়ে গভীর প্রভাব ফেলেছে।

মাদার তেরেসা তাই শুধু একটি নাম নন; মানবসেবার ইতিহাসে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। স্কপিয়ের ছোট্ট অ্যাগনেস থেকে কলকাতার ‘মাদার’, নোবেলজয়ী এবং পরবর্তীতে বিশ্বব্যাপী মানবসেবার প্রতীকে পরিণত হওয়ার তাঁর দীর্ঘ যাত্রা মনে করিয়ে দেয়—মানুষের জন্য করা কাজই অনেক সময় মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে থাকে।

তাঁর ১১৬তম জন্মবার্ষিকীতে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি এই মহীয়সী নারীকে। তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দিক—মানবিকতা কোনো সীমানায় আবদ্ধ নয়। মানুষের দুঃখ-কষ্টের পাশে দাঁড়ানো, ভালোবাসা ও সহমর্মিতা প্রকাশ করা এবং অসহায়কে মর্যাদা দেওয়া—এসবই মানবতার চিরন্তন শিক্ষা।

মাদার তেরেসা আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া মানবসেবার উত্তরাধিকার এখনো বিশ্বের নানা প্রান্তে মানুষের কাজকে অনুপ্রাণিত করে। মানুষের দুঃখের পাশে দাঁড়ানো প্রতিটি মানবিক উদ্যোগে তাঁর জীবন যেন নতুন করে কথা বলে।


এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ